কীভাবে বুঝবো আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি সন্তুষ্ট?

মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার সন্তুষ্টি অর্জনের সর্বাত্মক চেষ্টা করে। বাবা-মা, শিক্ষক, স্ত্রী-সন্তান, বন্ধুবান্ধব, যাকেই আমরা ভালোবাসি তাদেরকে সন্তুষ্ট করার নানান উপায় অবলম্বন করি। কাজে কর্মে সবসময় উন্মুখ হয়ে থাকি কীভাবে তাদের খুশী করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষের প্রতি এই ভালোবাসা সবসময় ভালো ফলাফল বয়ে আনে না। ক্ষেত্রবিশেষ তাদের সন্তুষ্টি আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর তারা অসন্তুষ্ট হলে বিষয়টি এতটাই যন্ত্রণার কারণ হয় যে, আমরা নিজেদের ক্ষতি করে বসি।

আসলে দুনিয়া ও আখিরাতের সমূহ কল্যাণ আল্লাহর সন্তুষ্টির মাঝেই নিহিত। যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হোন, তার জন্য কল্যাণের সকল দ্বার উন্মোচন করে দেন। দুনিয়ার কোনো শক্তি তাকে প্রতিহত করতে পারে না। কোনো ব্যর্থতা তাকে রুখে দিতে পারে না। কোনো অকল্যাণ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। সে সর্বদা আল্লাহর চোখে চোখে থাকে। আর যাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রাখেন, তার ক্ষতি করবে কে?

এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের ব্যাপারে বলেছেন, ‘আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট; এটা মহা সফলতা।’ [সূরা মায়িদা, ৫: ১১৯]

প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে বুঝবো আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি সন্তুষ্ট? তিনি আমাদের প্রতি রাগান্বিত নন? কীভাবে জানবো, তিনি আমাদের ভালো চাচ্ছেন?

(১) আমল সহজ হওয়া
পূর্বসূরি আলিমগণ বলতেন, আল্লাহ যার প্রতি সন্তুষ্ট, তিনি তার জন্য আমল করা সহজ করে দেন। তাকে আমলে অবিচলতা দান করেন। দুনিয়ার কোনো ব্যস্ততা তাকে বিরত রাখতে পারে না। কোনো ভালোবাসা ভুলিয়ে দিতে পারে না আল্লাহর কথা।

(২) বিপদের সময় দৃঢ়তা
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাকে বিপদের সময় হৃদয়ে দৃঢ়তা দান করেন। তাকে হতাশা কাবু করতে পারে না। জীবনে যত বিপদ আপদই আসুক, তার সবর হবে পাহাড়-সম। হতাশার স্রোতে সে ভেসে যাবে না। আল্লাহ বলেন,
‘(যারা) অর্থ-সংকটে, দুঃখ-কষ্টে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করে, তারাই সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী।’ [সূরা বাকারা, ২: ১৭৭]

(৩) তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা
এমন বান্দা আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে। স্বল্প রিজিকেই সে সন্তুষ্টি খুঁজে পায়। অভিযোগ করে না। অর্থ সম্পদের বিশাল স্তূপে শুয়ে ধনীরা যখন নির্ঘুম রজনী কাটায়, সে তখন শক্ত জমিনে শুয়েও প্রশান্ত মনে ঘুমায়। অন্যের জাগতিক সাফল্য তাকে হিংসুটে বানায় না। কেউ বিপদগ্রস্ত হলে অবজ্ঞার হাসি দেয় না। সে সর্বদা সন্তুষ্ট এবং এই বিশ্বাস পোষণ করে, ‘আল্লাহ যা করেন, বান্দার ভালোর জন্যই করেন।’

(৪) আল্লাহর সাথে নির্জনতা
দুনিয়ার প্রেমিকরা তাদের প্রেমিকাকে নির্জনে পেতে চায়। স্বামী ভালোবাসে তার স্ত্রীর মাঝে প্রাইভেসি থাকুক। স্ত্রী ভালোবাসে, তার স্বামীর ভালোবাসায় দ্বিতীয় কেউ ভাগ না বসাতে আসুক। বৃদ্ধ বাবা-মা ভালোবাসেন, সন্তান যেন তাদের ভুলে না যান।

তেমনিভাবে আল্লাহর প্রিয় বান্দা আল্লাহকে নির্জনে পেতে ভালোবাসে। বরং আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা হয় আরও পবিত্র, আরও উঁচু। সে সুযোগের সন্ধানে থাকে, কখন নিভৃতে মাওলার সাথে কথা বলবে। সময় পেলেই যিকিরে, কুরআন তিলাওয়াতে ডুবে যায়। লোকচক্ষুর আড়ালেই খুঁজে পায় ঈমানের আসল স্বাদ।

(৫) নেককারদের ভালোবাসা
বিখ্যাত এই হাদীসটি আমরা অনেকেই জানি, আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, সৃষ্টির অন্তরেও তার প্রতি ভালোবাসা ঢেলে দেন। [সহীহ বুখারী (৬০৪০)]

এর অর্থ কি তারা সেলেব্রিটি? হাজার ফ্যান ফলোয়ারের অধিকারী? না। বরং একজন ব্যক্তিকে মানুষ বহুবিধ কারণে ভালোবাসে। কেউ ভালোবাসা প্রদর্শন করে ব্যক্তির ক্ষতি থেকে বাঁচতে, কেউ ভালোবাসে তার পাপাচারের কারণে, তাকে বিনোদন দেয় বলে, কেউ ভালোবাসে তার জাগতিক সাফল্য দেখে, সমাজে অনেক নাম ডাক আছে বলে। এদের ভিতর একটি দল আছে, যারা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসে। তারা হলো নেককার বান্দা। আল্লাহ যার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, নেককারদের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা ঢেলে দেন। নেক বান্দারা তাকে ভালোবাসে, সেও তাদের ভালোবাসে।

(৬) ইলমে দ্বীন তার প্রিয়
আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান, ইলমে দ্বীন তার প্রিয় করে দেয়া হয়, দ্বীন শিক্ষা তার জন্য সহজ হয়ে যায়। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন,
‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, মহান আল্লাহ তাদ্বারা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। নিশ্চয় ফিরিশতামণ্ডলী ঐ অন্বেষণের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে শিক্ষার্থীর জন্য নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেন। জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসীরা, এমনকি পানির নিচের মাছ। অজ্ঞ ইবাদত গুজারের তুলনায় জ্ঞানী ব্যক্তি ঠিক সেরকম মর্যাদাবান, যেমন পূর্ণিমার রাতের চাঁদ তারকারাজির উপর দীপ্তিমান। আর জ্ঞানীগণ নবীদের উত্তরাধিকারী।’ [সহীহ আল জামিঈ (৬২৯৭), সহীহ: আলবানী]

আল্লাহ আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হলে কী পাবেন?

এর উত্তরে একটি হাদীসে কুদসী উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করি:
নবীজি (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা রাখে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার বান্দা ফরয ইবাদতের চাইতে আমার কাছে অধিক প্রিয় কোনো ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না। আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারাই সর্বদা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয়পাত্র বানিয়ে নিই। আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। আমার কাছে সে কিছু চাইলে আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায় আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দিই। আমি যে কোনো কাজ করতে চাইলে তাতে কোনো রকম দ্বিধা করি না, যতটা দ্বিধা করি মুমিন বান্দার প্রাণ হরণে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে থাকে, অথচ আমি তার প্রতি কষ্টদায়ক বস্তু দিতে অপছন্দ করি।’ [সহীহ বুখারী (৬৫০২)]
▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂
.
‘ওয়াফী লাইফ’ পেইজ হতে সংগৃহীত! (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)
.
.
(Y) শেয়ার করুন, বন্ধুদের সাথে ইন শা আল্লাহ !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *