কিছু ভালোবাসার সম্মান কখনো শেষ হয় না

কিছু ভালোবাসার সম্মান কখনো শেষ হয় না 💝

কাল আমার বিয়ে, এতো রাতে ডায়েরি লিখতে বসলাম। হ্যাঁ কাল আমার বিয়ে, গত চার বছর প্রেম করার পর কালকে বিয়ের পিড়িতে বসতে যাচ্ছি, তবে বর আমার প্রেমিক নয়। বাড়ি থেকে ঠিক করা পছন্দের ছেলে। আজকে গায়ে হলুদ ছিল কিছুক্ষণ আগেই শেষ হলো। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়। শুধু আমার ঘুম আসছে না। কি করবো এতো সহজে কি ভোলা যায়..! চার বছর..!! কতগুলো দিন কতগুলো ঘন্টা কতগুলো মিনিট আর কতগুলো সেকেন্ড হয় চার বছরে..!!! এই পুরোটা সময় ধরে যে তাকেই ভালোবেসে গেছি আমি। আর সে..?? তার ভালোবাসা আমার প্রতি কেমন ছিল তা বোঝানোর ক্ষমতা স্রষ্টা আমাকে দেয়নি। শুধু এতোটুকুই জানি মা বাবার পর যদি কেউ আমাকে অনেকটা ভালোবেসে থাকে তাহলে সেটা একমাত্র শায়ান.. এই চারটা বছর একটু একটু করে সম্পর্কটা তৈরি করছি আমরা। খুব যত্নে আগলে রেখেছি আমাদের ভালোবাসাটাকে। কত স্বপ্ন ছিলো দু’চোখ ভরা।

কিন্তু প্রব্লেমটা কোথায় ছিল..? পরিবার…
বাড়ি থেকে কোনভাবেই মেনে নিলো না ওকে..
বেকার ছিলো শায়ান। তবুও বাড়িতে ওর কথা বললাম। ও সবার সাথে কথা বলেছে, অনেক বোঝানোর চেষ্টাও করেছে। আমিও চেষ্টা করেছি আমার সাধ্যমত। কিন্তু কোন লাভ হয়নি…
.
.
.
.
অবশেষে ভালোবাসার টানে ঘর ছাড়তে চাইলাম, কিন্তু শায়ান রাজি হলো না। ও বললো : “সবার মনে কষ্ট দিয়ে সুখী হতে পারবোনা আমরা, মা বাবার সম্মান রক্ষা করতে না পারলে কেমন সন্তান আমরা..? এভাবে সবার থেকে পালিয়ে গিয়ে আমাদের ভালোবাসা স্বীকৃতি পেলেও আমাদের প্রতি আমাদের মা বাবার যে ভালোবাসা আছে তার যে বেশী অপমান হয়ে যাবে।” এরকম কত কিছু বোঝালো আমাকে। আমার সেই পাগলটা কত বুঝতে শিখে গেছে তা টেরই পেলাম না আমি। হয়তো সময়ই সব কিছু শিখিয়ে দেয় মানুষকে, সময়ই সহ্য ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
.
.
শেষ যেদিন যখন দেখা হলো আমাদের, কেউ কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারছিলাম না। ওর চোখগুলো খুব লাল ছিল, উস্কখুস্ক চুল। পুরোটা সময় ধরে মাটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম দুজনেই। দুজনেই যেন ভাষাশূন্য হয়ে পড়েছিলাম। অথচ এইতো কদিন আগেও কথা যেন শেষই হতো না। আর সেদিন শেষবারের মতো কথা বলতে গিয়েও কোন কথাই যেন খুজে পাচ্ছিলাম না। শুধু বললাম ভালো থেকো, ও শুধু মাথা নাড়লো।
.
.
কাল বিয়ে, এক বুক শূন্যতা নিয়ে যাচ্ছি আর একজনের ঘর পূর্ন করতে, কি অদ্ভুত..!
.
.
.
<২৯শে ফেব্রুয়ারি ২০১৬>

আজ বড় ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে থেকে রূপকথা (আমার মেয়ে) কে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। স্টেশনে বসে রূপকথাকে বললাম পানি নিয়ে আসতে।
হঠাৎ কেউ পেছন থেকে বললো,
নীলা… কেমন আছো ?
গলাটা শুনে চিনতে ভুল হলো না। পিছন ফিরে তাকালাম, শায়ান দাঁড়িয়ে আছে। কাঁচাপাকা চুল, চোখে চশমা। কিন্তু চোখগুলো সেই আগের মতোই আছে, তাকানোর ধরনটাও আগের মতোই আছে। বুক ভেঙে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো। কিছুক্ষন থেমে বললাম ভালো আছি। তুমি কেমন আছো..? অনেকদিন পর দেখা তাই না..?
ও হাসলো, তারপর পাশে এসে বসলো। বললো ভালোই আছি। বুড়ি হয়ে গেছো দেখছি।
আমি হাসলাম। ওকে জিজ্ঞেস করলাম বিয়ে করেছো ?
ও হাসলো, কিছু বললো না।
কত কথা বলার ছিল, কতবছর পর দেখা, তবু যেন বলার কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমি। জিজ্ঞেস করলাম, খুব কষ্ট হয়েছিল নিজেকে সামলাতে ?
ও বললো, তুমি তো আমার চেয়ে বেশী কষ্টে ছিলে, আমিতো তবু নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারতাম, আর তোমাকে তো শ্বশুর বাড়িতে সব চেপে হাসিমুখে সবকিছু সামলাতে হতো, তাই না ?
আমি বললাম, আমাকে মনে পড়তোনা তোমার ?
ও একটু হেসে বললো, থাক না এগুলো এখন। আচ্ছা নীলা, এই সময়টা পারতো না অন্যরকম হতে ?
আমি বললাম, পারতো, কিন্তু ভাগ্যে যে এটাই ছিল।
ও বললো, আকাশী শাড়িতে তোমাকে আগের মতোই সুন্দর লাগে ।
আমি হাসলাম, রূপকথা চলে আসলো পানি নিয়ে, শায়ানকে বললাম এই আমার মেয়ে ।
শায়ান রূপকথাকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তোমার নাম কি মা ?
“আমার নাম রূপকথা”
শায়ান আমার দিকে তাকালো। ওর ঠোঁট কাঁপছিল। জানি ওর অনেক পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে এখন । ও ঠিক করে রেখেছিলো, আমাদের বিয়ের পর মেয়ে সন্তান হলে নাম রাখবে ওর নাম রাখবে রূপকথা ।
রূপকথা বললো, মা ট্রেন এসে পড়েছে চলো।
রূপকথাকে এগোতে বললাম। আমিও উঠে দাড়িয়ে বললাম, আসি তাহলে ?
ও বললো, এখনো ভালোবাসো..?
আমি বললাম, তা জানিনা, কিন্তু আমাদের ভালোবাসার অসম্মান হবে বলে এখনো সুন্দর করে সংসার করে যাচ্ছি। তুমি একদিন বলেছিলে, বিয়ের পর আমি উল্টো পাল্টা কিছু করলে আমার ফ্যামিলি তোমাকে দোষ, বলবে তোমার জন্যই আমি সব করেছি । সেই ভয়ে আজ পর্যন্ত এমন কিছু করিনি যাতে কেউ তোমার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলে । বলতে বলতে আমার চোখ ঝাপসা হতে শুরু করেছে, আর চোখের সামনে ভাসতে শুরু করেছে ঝাপসা অতীত, ঝাপসা সোনালী স্মৃতি।
ও বললো, এটাই কি শেষ দেখা ?
আমি বললাম, নাহ্ দেখা যখন হলো আবার হয়তো হবে, হারিয়ে যাওয়ার জন্যে পৃথিবীটা অনেক ছোট।
ও বললো, শান্তনা একটাই যে ভুল মানুষকে ভালোবাসিনি। সব কিছুই ঠিক ছিল শুধু পরিস্থিতিটা ঠিক ছিলোনা।
আমি বললাম, ভালো থেকো শায়ান।
১৬ বছর আগের মতো ও শুধু মাথা নাড়লো ।
আমি ট্রেনে গিয়ে উঠলাম, ট্রেন চলতে শুরু করলো, আস্তে আস্তে ট্রেনের দূরত্ব বাড়তে লাগলো । শায়ানকে চশমা খুলে চোখ মুছতে দেখলাম, হয়তো ট্রেন চলতে শুরু করেছে বলে ধূলো ওর চোখে চলে গেছে, আবার হয়তো অন্যকিছু । সব কিছু জানতে নেই।
সবকিছু কি ১৬ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে ?
এখনো কোন মধ্যরাত কিংবা বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টি মুখর সন্ধ্যাবেলায় এই ভালোবাসার মানুষ গুলোর চোখের কোণ ভিজে উঠে, তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করে বুকের বা পাশে । ভালোবাসা কখনো শেষ হয়ে যায় না। সময় ও পরিস্থির কাছে হার মেনে সময়ের স্রোতে অনেক ভালোবাসাই হারিয়ে যায়।
কিন্তু কোথাও না কোথাও একটু খানি থেকেই যায়…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *